রবিবার, ১২ আগস্ট, ২০১২

ভাওয়াইয়ার ফেরিওয়ালা সফিউল আলম রাজা ‘ভাওয়াইয়া রাজা’

এম আর জান্নাত স্বপন : সফিউল আলম রাজার জন্ম ভাওয়াইয়া’র তীর্থ স্থান চিলমারীর বন্দরে। সেই ছোট্ট বেলায় রেডিওতে আব্বাস উদ্দিন আর কছিম উদ্দিনের গান শুনে সঙ্গে সঙ্গে গাওয়ার চেষ্টা করতেন রাজা। এ নিয়ে তার মা শামসুন্নাহার বেগম প্রায়ই মজা করতেন। স্থানীয় একটি অনুষ্ঠানে গান শুনে মুগ্ধ হন উত্তরাঞ্চলের বিখ্যাত শিল্পী,গীতিকার, সুরকার নুরুল ইসলাম জাহিদ। তিনি রাজাকে বললেন, তোমার তো কণ্ঠ অনেক ভালো, অনুশীলন করলে আরো ভালো করবে। তারপর তিনিই ‘আমারই প্রতিভা সঙ্গীত নিকেতনে’ গান শেখার ব্যবস্থা করে দেন।
এভাবেই গানের জগতে রাজার যাত্রা শুরু। এতো গান থাকতে ভাওয়াইয়ার প্রতি এ আলাদা দরদ কেন ? এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘ভাওয়াইয়া গানে তিনি অন্যরকমের সুর-আবেদন, প্রাণ খুঁজে পান। এছাড়া ওস্তাদ নুরুল ইসলাম জাহিদ যে ভাওয়াইয়া গান লিখতেন তা রাজার খুবই ভালো লাগতো। এভাবেই ভাওয়াইয়া গানের প্রতি সফউল আলম রাজার দূর্বলতা তৈরি হয়। পড়া-শোরার পাশপাশি গান-বাজনা নিয়ে বেশ মেতে ছিলেন সফিউল আলম রাজা। তারপর স্থানীয় এনজিওতে পার্টটাইম ও পরবর্তী সময়ে ফুলটাইম মিউজিক টিচারের কাজ করেন। একটা সময় রাগ করে চাকরি ছেড়ে দিয়ে বেশ দুরবস্থায় পড়ে যান রাজা। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লক্ষে চলে আসেন ঢাকায়। সম্বল কেবল গান ও লেখালেখি জানার গুণ। শুরু হয় বিভিন্ন পত্রিকায় ফিচার লেখা। আগেও স্থানীয় পত্রিকা গুলোতে লিখতেন। ঢাকায় এসে – আল মুজাদ্দেদ, জনকণ্ঠ, সংবাদ সহ আরো কিছু পত্রিকায় লেখালেখি। সময়ের ব্যবধানে সাংবাদিক হিসেবে একটা গ্রহণ যোগ্যতা তৈরি হয় তার। সাংবাদিকতার বিষয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন রাজা। এর মধ্যে ২০০০ সালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুরস্কার, ২০০১ সালে ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল(টিআইবি) পুরস্কার, ২০০৩ সালে ক্রাইম রিপোর্টারর্স এসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড, ২০০৪ সালে ডেমক্রেসি ওয়াচ- এর হিউম্যান রাইটস অ্যাওয়ার্ড, ২০০৬ সালে ইউনেস্কোক্লাব এসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড উল্লেখ যোগ্য। বতর্মানে তিনি দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার। সাংবাদিকতার পাশাপাশি শত বাধা-বিপত্তিতেও গানের প্রতি ভালোবাসা ধরে রেখেছেন রাজা। গভীর রাতে বাসায় ফিরে তাই গান চর্চায় বসে যেতেন। ২০০১ সালে ধানমন্ডির আড়িয়াল সেন্টারে ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’ শিরোনামে রাজার প্রথম একক সঙ্গীত সন্ধ্যা অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৫ সালে বিশ্বসঙ্গীত দিবস উপলক্ষ্যে অাঁলিয়স ফ্রসেজ রাজার একক সঙ্গীত সন্ধ্যা’র আয়োজন করেছিলো। এছাড়া ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারী বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর আয়োজনে সফউল আলম রাজার এককসংগীত সন্ধ্যা অনুষ্ঠিত হয়।এছাড়াও বিভিন্ন টিভি-চ্যানেল ও মঞ্চে নিয়মিত গান করছেন রাজা।
বেঙ্গল বিকাশ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণরাজার সংগীত জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এ নিয়েও তার মজার ঘটনা রয়েছে। দৈনিক পত্রিকায় কালচার বিট করেন। বেঙ্গল বিকাশ প্রতিযোগিতার সংবাদ সম্মেলন কাভার করতে গিয়ে রাজা জানতে পারেন ‘বেঙ্গল বিকাশ’ নামে শিল্পীতের ট্যালেন্ট হান্টের কথা। এরপর তিনি নিজেই এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। আর এ প্রতিযোগিতায়ই লোকসঙ্গীত বিভাগে শ্রেষ্ঠ মান পেয়ে বিজয়ী হন সফউল আলম রাজা।
ভাওয়াইয়া গান নিয়ে অনেক পরিকল্পনা তার। এ গানকে নগরজীবনে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি সারা বিশ্বের বাংলাভাষাভাষি মানুষের কাছে জনপ্রিয় করতে চান তিনি। রাজার ভাষায় ‘ আমার মনে হয় ভাওয়াইয়ার প্রসারে প্রচার মাধ্যমগুলো সেভাবে এগিয়ে আসছে না। রেডিও, টেলিভিশনে আরো বেশি করে ভাওয়াইয়া গান প্রচার করা উচিত।’
সাংবাদিকতা এবং গান দুটি নিয়েই সৃষ্টিশীল স্বপ্ন দেখেন রাজা। আরো বহুদূর যেতে চান তিনি সফলতা নিয়ে।২০০৮ সালের ২২ এপ্রিল গানের দল ‘ভাওয়াইয়া’ প্রতিষ্ঠা করেন রাজা। ইতিমধ্যে এই দলের উদ্যোগে রাজধানীতে ‘ছয়মাস ব্যাপী ভাওয়াইয়া কর্মশালা’ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়াও এই দলের প্রচেষ্ঠায় সরকারি উদ্যোগে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে ‘পনের দিনব্যাপী ভাওয়াইয়া কর্মশালা’ সম্পন্ন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সফিউল আলম রাজা ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত ‘উত্তরের সুর’ ও ‘আদম হাওয়া’ সিনেমায় ৭টি ভাওয়াইয়া গেয়েছেন। ছবি দুটির পরিচালক শাহনেওয়াজ কাকলী ও রেজানুর রহমান। গত পহেলা বৈশাখে মুক্তি পেয়েছে উত্তরের সুর সিনেমাটি। প্রসঙ্গতঃ চার দশক আগে ফেরদৌসী রহমান ও রথীন্দ্রনাথ রায় সিনেমায় ভাওয়াইয়া গেয়েছেন। আর দীর্ঘ সময় পর দুটি সিনেমায় মৌলিক ভাওয়াইয়া গান করলেন সফিউল আলম রাজা। ২০১১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী থেকে গানের দল ‘ভাওয়াইয়া’র পরিচালনায় রাজধানীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘ভাওয়াইয়া স্কুল’। স্কুল-এর পরিচালক ও প্রধান প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন রাজা। রাজা বাংলাদেশ বেতারের বিশেষ ও টেলিভিশনের প্রথম শ্রেণীর শিল্পী। এছাড়াও দেশের প্রতিটি চ্যানেলেই তিনি নিয়মিত ভাওয়াইয়া পরিবেশন করে আসছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন (২০১১ সালে ) ‘ভাওয়াইয়া গানে ঈদ আনন্দ’ নামে সফউল আলম রাজা’র একটি একক অনুস্ঠান প্রচার করে-যেটি দেশে-বিদেশে বেশ প্রশংসা পেয়েছে। এছাড়া বিদেশী চ্যানেলের মধ্যে কলকাতার ‘তারা মিউজিক’, ‘তারা নিউজ’, ‘কলকাতা টিভি’ সহ বেশ ক’টি চ্যানেলে ভাওয়াইয়া গেয়ে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন রাজা। দেশের প্রায় প্রতিটি চ্যানেলেই বিশেষ দিনে বিশেষ ভাওয়াইয়া পরিবেশন করে থাকেন রাজা ও তার গানের দল ‘ভাওয়াইয়া’র সদস্যরা। বেশ কটি টিভি নাটকেও রাজা ভাওয়াইয়া গান দিয়ে টাইটেল করেছেন।
ইতিমধ্যে রাজার ভাওয়াইয়া গানের সাথে দেশের বিশিষ্ট নৃত্যপরিচালক কবিরুল ইসলাম রতন ও তার দল নাচ করে দেশের সংস্কৃতিমহলে দৃষ্টি কেড়েছেন।বেঙ্গল ফাউন্ডেশন থেকে রাজার একটি ‘মিক্সড অ্যালবাম’ এবং ‘ভায়োলিন মিডিয়া’ থেকে ‘কবর দেখিয়া যান’ শিরোনামে একক অ্যালবাম বেরিয়েছে। রাজার গানের দল ‘ভাওয়াইয়া’ এবং ‘ভাওয়াইয়া স্কু’ এর লক্ষ্য হচ্ছে-ভাওয়াইয়া গানের বিপুল ভান্ডারকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা এবং বাংলাদেশ সহ সারাবিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী ও অন্যান্য মানুষের মধ্যে এই গান ছড়িয়ে দেয়া। রাজার ভবিষ্যত ইচ্ছে-আব্বাস উদ্দীনের গানের চিলমারী বন্দরে একদিন ‘ভাওয়াইয়া ইন্সটিটিউট’ প্রতিষ্ঠা পাবে। এর পাশেই থাকবে ‘ভাওয়াইয়া আকড়া’। ‘ভাওয়াইয়া ইন্সটিটিউট’-এ দেশ-বিদেশের ছেলে-মেয়েরা যাবেন ভাওয়াইয়া শিখতে। রাজা’র মমতা মাখা সুরে মোহিত শ্রোতারা তাকে ডাকেন ‘ভাওয়াইয়া রাজা’, আবার অনেকে ডাকেন ‘ভাওয়াইয়া গানের ফেরিওয়ালা’ বলে।রাজার এলাকায় বলেন ‘হামার ছাওয়া রাজা’। যে যে নামেই ডাকুক ; আমাদের রাজা এগিয়ে যাক-আরো দূর বহুদূর আমাদের ঐতিহ্যকে নিয়ে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন