‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, হাকাও গাড়ী তুই চিলমারীর বন্দরে’

‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, হাকাও গাড়ী তুই চিলমারীর বন্দরে’ ভাওয়াইয়া ও পল্লীগীতির সম্রাট আব্বাস উদ্দিন চিলমারীতে জম্মাননি। তবুও তিনি চিলমারীর মানুষের আত্মার মানুষ। ১৯১৩ সালের কথা। শিল্পীর দুর সম্পর্কের এক চাচা চাকুরী করতেন এখানে। সেই সুবাদে তিনি চিলমারীতে ছিলেন বছর খানেক। সে সময় সুদেন বাবু ও সুরেশ বাবুর সাথে গড়ে উঠে শিল্পীর আত্মার সম্পর্ক। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মিশুক প্রকৃতির। ১৯৫০ কি ১৯৫২ হবে। শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের জনপ্রিয়তা তখন গগনচুম্বী। চিলমারীতে রেখে যাওয়া শিল্পীর বাল্য জীবনের খেলার সাথী সুদেন বাবু, সুরেশ বাবুরা আমন্ত্রণ জানালেন শিল্পীকে। জীবন প্রবাহে ফেলে আসা চিলমারীকে তার মনে পড়লো। হৃদয়ের টানে চিলমারীর পানে আসবেন বলে তিনি কথা দিলেন। দিন, ক্ষণ তারিখ ঠিক হয়ে গেল। মঞ্চ তৈরী করা হলো পুরাতন বন্দর নগরী চিলমারী বাজারে। মহুকুমা শহর কুড়িগ্রাম থেকে চিলমারী আসবার জন্য কোন পরিবহন ব্যবস্থা ছিল না। পরিবহন ব্যবস্থা বলতে যা ছিলো তা হলো গরুর গাড়ি। পরবর্তীতে রংপুর  থেকে একটা কয়লার ইঞ্জিন সমন্বিত রেল গাড়ি ঝিক্ ঝিক্ আওয়াজ আর কান তালা লাগানো হুইসেল বাজিয়ে মহুকুমা শহর পর্যন্ত আসতো। তার পরেই যন্ত্র সম্বলিত দানবের দৌড় শেষ। শুরু হতো গরুর গাড়ির ক্যাঁচর ক্যাঁচর। শিল্পী কুড়িগ্রামে এসে পৌঁছলেন বিকাল ৪টায়। শিল্পীকে নিয়ে আসবার জন্য পাঠানো হয়েছে গরুরগাড়ী। চিলমারী থানার রমনা নিবাসী গাড়িয়াল আব্দুল গনি তখন অপেক্ষায় শিল্পীর। শিল্পীর অপেক্ষায় হাজার হাজার দর্শক শ্রোতা। সকাল দশটা থেকে তারা মঞ্চের সামনে বসে অপেক্ষমান। ম্যানেজিং কমিটির ঘন ঘন শান্তনা বাণী শুনতে শুনতে দর্শকের প্রাণ ওষ্ঠাগত। কিন্তু শিল্পী নেই। মাঝে মাঝে দর্শকের কোরাস চিৎকারে সুদেন বাবু, সুরেশ বাবু তখন বিব্রতকর পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যস্ত। ওদিকটায় গরুর গাড়ীর কাঁচর ক্যাঁচর শব্দ তুলে ছুটে চলছে চিলমারী বন্দরে। সুর্য ডুবু ডুবু। শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আর সহোদর ভাই আবদুল করিম। যোগাযোগ ব্যবস্থার এ নাজেহাল অবস্থায় পরে দু‘ভাই অনুধাবন করেছিলেন অপেক্ষমান দর্শকের প্রকৃত অবস্থা। দর্শককুলকে শান্ত করতে হবে। প্রমাণ করতে হবে আব্বাস-আব্বাসই। চলন্ত গাড়ীর ছই এর তলে বসে আব্দুল করিম লিখলেন কিংবদন্তির সেই গান “ওকি গাড়ীয়াল ভাই হাকাও, গাড়ী তুই চিলমারীর বন্দরে”। সুর করলেন শিল্পী নিজেই। চিলমারীতে আব্বাস উদ্দিন যখন পৌঁছলেন তখন সন্ধ্যার কালো আধাঁর নেমে এসেছে পৃথিবী জুড়ে। মঞ্চে উঠেই তিনি শুরু করলেন বিখ্যাত এই গানটি। শিল্পী আব্বাস উদ্দিন কিংবদন্তি হয়ে রইলেন চিলমারীর মানুষের হ্নদয়ে সেই বিখ্যাত গানটি গেয়ে ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, হাকাও গাড়ী তুই চিলমারীর বন্দরে’,  শিল্পীর সেই বন্ধুরা আজ আর বেঁচে নেই। বেঁচে নেই শিল্পী নিজেও। চিলমারীর মাটি ও মানুষের প্রাণের শিল্পী আব্বাস উদ্দিনকে স্মরণীয় করে রাখতে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আব্বাস উদ্দিন একাডেমী। সংগীত এবং নাটকের মাধ্যমে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের যে কৌশল শুরু হয় তাতে চিলমারীর অবদান স্মরণীয়। ১৯৩৩ সালে চিলমারীতে ২টি নাট্য সংগঠন ছিল ‘চিলমারী নাট্য সংস্থা’ এবং ‘শাখাহাতি নাট্য সংস্থা’,  চন্দ্রগুপ্ত, সুলতানা রাজিয়া ও রংগিলা নায়ের মাঝি ঐ সময়ের উল্লেখযোগ্য নাটক। অনেক পরে হলেও খরখরিয়া শিল্পী গোষ্ঠি, জোড়গাছ স্মৃতি সংসদ, নিবেদিতা সাংস্কৃতিক সংগঠন, প্রত্যাশা ক্লাব, আব্বাস উদ্দিন একাডেমী, আরডিআরএস, থানাহাট ইউনিয়ন সমাজ কল্যাণ সংস্থা, শিহরণ গণনাট্য দল এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে।

তথ্য সূত্রঃ কুড়িগ্রাম জেলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি, লেখক- মোস্তফা তোফায়েল হোসেন ও চিলমারী ইস্তেহার, লেখক- সাংবাদিক সহকারী অধ্যাপক নাজমুল হুদা পারভেজ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন