চিলমারীর ইতিহাস


বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে অবহেলিত ও নদী বিধৌত কুড়িগ্রাম জেলা। বন্যা, খড়া, নদী ভাঙ্গণসহ নানা প্রাকৃতিক দূর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা একটি উপজেলার নাম চিলমারী। কুড়িগ্রাম জেলা সদরের পর উলিপুরের উপর দিয়ে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তার মধ্যখানে এবং নদী দু‘টির তীরে অবস্থিত চিলমারী। অত্যন্ত প্রাচীন এ এলাকার দক্ষিণে রয়েছে চর রাজিবপুর এবং পশ্চিমে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা। উত্তরে উলিপুর, পূর্বে রৌমারী। প্রাচীন বন্দরনগরী চিলমারী ব্যবসা-বাণিজ্যে, শিল্পে, সংস্কৃতিতে একটি সমৃদ্ধশালী উপজেলা। নিজস্ব ইতিহাস, গৌরব, সকিয়তা নিয়ে চিলমারীর মানুষ আজও টিকে আছে। নদী ভাঙ্গণের ফলে এখানকার মানুষজন হয়ে পড়েছে দরিদ্র থেকে অতিদরিদ্র। প্রথমে ‘বাসন্তি’ উপাখ্যান পরে তা ‘মঙ্গা’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এ উপজেলা থেকে জেলা শহরের দূরত্ব রেলপথে ৩৫ কিঃ মিঃ এবং সড়ক পথে ৩০ কিঃ মিঃ। বিভাগীয় শহর রংপুর সড়ক পথে ৮৫ কিঃ মিঃ এবং রাজধানী ঢাকা শহরের সাথে প্রধানতঃ সড়ক পথে যোগাযোগ সাধিত হলেও রংপুর জেলার কাউনিয়া থেকে ট্রেন তিস্তা অথবা একতায় রাজধানী শহরে যাওয়া যায়।

৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ উপজেলার অধিকাংশ নদী বিধৌত নিম্ন প্লাবিত সমভূমি। বন্যার সঙ্গে পরিবাহিত পলি মাটি সঞ্চিত হয়ে প্লাবিত সমভূমি গঠিত হয়েছে। ৬টির মধ্যে ৩টি ইউনিয়ন অষ্টমীরচর, নয়ারহাট ও চিলমারী ব্রহ্মপুত্রের ওপারে চর অঞ্চল নিয়ে গঠিত। কেবলমাত্র নৌপথে ঐসব অঞ্চলে যাওয়া যায়। অপরদিকে, অবশিষ্ট ৩টি ইউনিয়ন থানাহাট, রমনা ও রাণীগঞ্জের সাথে সড়ক পথে যোগাযোগ রয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলার একটি তৃতীয় ছোট উপজেলা চিলমারী। আয়তন ২২৫ বর্গ কিলোমিটার।
ভৌগলিক অবস্থানঃ ২৫০ – ২র্৬ ও ২৫০ – ৪র্০ উত্তর অক্ষাংশে এবং ৮৯০ – ৩র্৮ ও ৮৯০ – ৪র্৮ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত।
মৌজা ৮৫টি, গ্রাম ১১৭টি, লোকসংখ্যা প্রায় ১,৩৯,৪৯২ জন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২.৫%, ভোটার সংখ্যা ৭৬,২২৮, শিক্ষিতের হার পুরুষ ৬০.১১%, মহিলা ৩৯.৮৯%, উপজেলায় থানার সংখ্যা ২টি চিলমারী ও ঢুষমারা। কৃষি আবাদযোগ্য জমি ৯,৮৩০ হেক্টর। এখানকার মানুষের প্রধান পেশা কৃষি কাজ। কৃষি পরিবার ১৭,৭৪৬টি। হাসপাতাল ১টি, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ক্লিনিক ১টি, পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিক ৩টি, কমিউনিটি ক্লিনিক ১২টি। সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৫৫টি, রেজিঃ বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩৩টি, এনজিও পরিচালিত প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৬৭টি, নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় ২টি, উচচ বালিকা বিদ্যালয় ৩টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৯টি, মাদ্রাসা ১১টি, কলেজ ৪টি, পশু হাসপাতাল ১টি, কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র ১টি, কেডিএবি পরিচালিত চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র ১টি, টেরট্রেস হোমস্ ফাউন্ডেশন পরিচালিত মা ও শিশু চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র ১টি, আরডিআরএস পরিচালিত যক্ষা ও কুষ্ঠ রোগী চিকিৎসা কেন্দ্র ১টি, বেসরকারী ইতিমখানা ২টি- গোলাম হাবিব শিশু সদন ও পরিজন নেছা ইসলামীয়া এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম ১টি, রেলওয়ে ষ্টেশন ২টি বালাবাড়ী হাট ও রমনা বাজার। পাকা রাস্তা ৩৫.৩৬ কিলোমিটার. আধাপাকা ২.২৮ কিলোমিটার, ব্রীজ/ কালভার্ট ১১৩টি। সরকারী নার্সারী ১টি, বেসরকারী নার্সারী ১২টি, জলমহাল ১টি, বাৎসরিক মৎস্য উৎপাদন ৩,৫০,০০০ কেজি, চাহিদা ৮,১০,০০০ কেজি। পোষ্ট অফিস ৭টি, বিদ্যুৎ সুবিধা ৬৮ গ্রাম, ভাসমান তেল ডিপো ২টি মেঘনা ও যমুনা, ব্যাংক ০৪টি, সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও গ্রামীণ ব্যাংক। এনজিও ২৯টি।
নামকরণে চিলমারীঃ
১৮৫০ সালে চিলমারী থানা নামে একটি ভূ-খন্ডের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা পায়। চিলমারী থানার নামকরণ নিয়ে বিশাল উপাখ্যান রয়েছে, রয়েছে নানা জনশ্রুতি আর নামকরণের কিংবদন্তি ছড়িয়ে থাকা নানান জনশ্রুতির মধ্যে কোনটি সঠিক তা স্পষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
জনশ্রুতি- ১ থেকে জানা গেছে, আজ থেকে কয়েক শত বছর পূর্বে চিলমারীর অধিকাংশ ভূ-খন্ডই ছিল বালূ দিয়ে ঢাকা। তখন নাকি এই চিলমারী নামক বালু রাজ্যে প্রচুর চিনা আবাদ হতো। এই কারণে নাকি এই জায়গাটির নামকরণ হয়েছিল চিনামারী। এখানে ‘মারী’ শব্দটি জায়গা বা স্থান। সেই চিনামারীই নাকি কালের বিবর্তনে আজকের চিলমারী শব্দে পরিণত হয়েছে।
জনশ্রুতি-২ থেকে জানা যায়, এককালে অত্র এলাকায় চিলা পাখির নাকি প্রচুর উপদ্রব দেখা দিয়েছিল। ধানী বা আবাদী জমিতে দল বেঁধে চিল পাখি উড়ে আসতো। নষ্ট করতো হাজার হাজার একর জমির ফসল। চিলের উপদ্রপে হাটে বাজারে স্বস্থিতে কেউ থাকতে পারতো না। সর্বত্রই চিল আতঙ্ক, জনজীবনকে বিপর্যস্থ করে তুলেছিল। এসকল চিল পাখি ব্রহ্মপুত্র উপকুলে দল বেঁধে ঘুরে বেড়াতো, বাস করতো বাঁশ ঝাড়ে, আম বাগান অথবা বটবৃক্ষের ডগায় চড়ে। জনশ্রুতি রয়েছে যদি কোন মানুষ ভুলেও একটি চিল পাখিকে হত্যা করেছে তো আর রক্ষা নেই। কোথা থেকে সঙ্গে সঙ্গে আসতো হাজার হাজার চিল পাখি। ছয় সাত দিন ধরে অত্যাচার চলতো ঐ মানুষটির বাড়ীর উপর। উপদ্রবের প্রতিকার চেয়ে তারা আবেদন করলো বৃটিশ সরকারের কাছে। বৃটিশ সরকারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত এলো চিল পাখিগুলোকে হত্যা করার। এই সিদ্ধান্তের বার্তাটি পৌঁছে গেল কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকায়। তাই তারা সংবাদ পাওয়া মাত্র তীর ধনু নিয়ে দল বেঁধে বৃটিশ সরকার প্রেরীত বন্ধুকধারী সৈনিকের পিছু পিছু ছুটে এলো চিলমারী থানার মানুষগুলোকে চিল পাখির হাত থেকে নিস্তার দেওয়ার জন্য। দল বেঁধে মানুষের বাতান নামলো চিলমারী থানার হাটে মাঠে-ঘাটে, আনাচে-কানাচে। দল বেঁধে তীর ধনু হাতে নিয়ে লোকজন যখন চিলমারীর পানে ছুটে আসছিল পথিমধ্যে অনেক না জানা লোক যখন দল বেঁধে এতগুলো লোককে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করলো আপনারা এভাবে কোথায় চলছেন? তখন ঐ মানুষের মিছিল থেকে একটি উত্তর ভেসে আসতো চলো চলো চিল-মারী শ্লোগানের মতো। এই শ্লোগান থেকেই নাকি চিলমারী শব্দের উৎপত্তি হয়েছে এবং এলাকার নামককরণ হয়েছে আজকের চিলমারী।
জনশ্রুতি-৩ থেকে জানা যায়, এক সময় ব্রহ্মপুত্র নদের উপকুল ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল এক নদী বন্দর। বড় নৌকা আর জল জাহাজ ভীড়তো এই নদী বন্দরটিতে। মালামাল খালাস করা হতো আবার জাহাজে নতুন করে মাল ভরে পাড়ি জমাতো অন্য বন্দরের পানে। ঐ সময় বৃটিশ প্রশাসন কর পরিশোধ করবার জন্য এই বন্দরটিতে একটি কাষ্টম অফিস স্থাপন করেছিল। কাষ্টম অফিসার যিনি ছিলেন তিনি কর পরিশোধ হওয়া মাত্রই মালের উপর সিল মেরে দিতেন। সেই সিল মারা দেখে অনেক অশিক্ষিত লোক তখন এই কাষ্টম অফিসটি সিল-মারী অফিস হিসেবে চিনতো। এই সিল-মারী কালের বিবর্তনে আজকের চিলমারী নামকরণ হয়ে গেছে।
বৃটিশ শাসনের প্রারম্ভে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বাহারবন্দ পরগনা এলাকায় নীল চাষের মাধ্যমে কৃষি শিল্পের শিল্পায়ন বিপ্লব ঘটিয়েছিল সেই নীলের কয়েকটি ফ্যাক্টরী ছিল তদানীন্তন রাণীগঞ্জে। নীল নামক পণ্য গোলাগুলোতে সিল মেরে রাখা হতো। অতপর জাহাজ বোঝাই করে বিদেশে চালান দেওয়া হতো। লেখক মোস্তফা তোফায়েল হোসেন বলতে চেয়েছেন এই সিল মারার জায়গা থেকে চিলমারীর নামকরণ করা হয়েছে।

প্রাচীন বন্দরনগরীঃ
এক সময় পাটের জন্য বিখ্যাত ছিল কুড়িগ্রাম জেলার এতিহ্যবাহী চিলমারী বন্দর। ব্রহ্মপুত্রের তীর ঘেঁষে গড়ে উঠা এই বন্দরটি পাট বেচা-কেনা, প্রসেসিং, দেশি-বিদেশী জাহাজের আসা-যাওয়া, দেশের নানা অঞ্চল থেকে আসা ব্যবসায়ী ও পাইকারদের আনাগোনায় মুখরিত ছিল রাতদিন। চিলমারী বন্দরে পাটের কারবার শুরু হয় তিরিশের দশকে। ব্রহ্মপুত্রের কোল ঘেঁষে কয়েক কিলোমিটার ব্যাপী ছিল বন্দরের অবস্থান। প্রশাসনিক ভবন, কাষ্টমস্ অফিস, বড় বড় পাটের গোডাউন। সীমান্তের ওপার আসামের সঙ্গে ফেরি সার্ভিস চালু ছিল এক সময়। জুট ট্রেডিং কোম্পানীসহ প্রায় ৩০টি পাটকল ও কোম্পানী এখানে কারবার জুড়ে বসে। স্থাপন করে বিশাল বিশাল পাট গুদাম। পাট প্রসেসিং ও বেল তৈরীর মেশিন স্থাপন করা হয়। পাট ক্রয়, বাছাই ও বেল তৈরীর কাজে প্রায় ৯‘শ শ্রমিক এখানে কাজ করত প্রতিদিন। এর বাইরে শত শত ব্যাপারী, কৃষক, ফড়িয়াদের আগমন হত এখানে। প্রায় ৩‘শ গরুর গাড়ির মাধ্যমে দূর-দূরান্ত থেকে পাট এনে নারায়ণগঞ্জ, দৌলতপুর, খুলনা ও চট্টগ্রামসহ নানা এলাকায় সরবরাহ করা হতো। বিদেশেও রপ্তানি করা হতো এখানকার উন্নতমানের পাট। কালের আবর্তে ব্রহ্মপুত্র নদের কড়াল গ্রাসে চিলমারী বন্দরটি সম্পূর্ণ রুপে নিশ্চিহ্ন হয়েছে। তাই চিলমারী উপজেলা সদর বর্তমানে থানাহাট ইউনিয়নে স্থানান্তরিত হয়েছে। রমনা ঘাট কুড়িগ্রাম জেলার অধিকাংশ মানুষের নিকট একটি দর্শনীয় স্থান। এখানে নৌকা ভ্রমণ যেমন আনন্দদায়ক, তেমনি নদী তীরে দাঁড়িয়ে বিবর্ণ চরাঞ্চল, মেঘালয়ের পর্বতরাশি এবং ব্রহ্মপুত্র নদের জলরাশি পর্যটকের মনে সৃষ্টি করে এক আবেগঘণ মুহুর্ত। শীতকালে এখানকার অষ্টমীরচর, নয়ারহাট ও চিলমারী ইউনিয়নে ব্রক্ষপুত্রের শাখা নদসমুহের এবং তার তীর জুড়ে বিভিন্ন প্রজাতির পাখীর আগমনে এলাকাটিকে আকর্ষণীয় করে তোলে। চিলমারীর রমনা, ফকিরেরহাট ও জোড়গাছ ঘাট থেকে প্রতিদিন বাহাদুরাবাদ, নারায়নগঞ্জ, চট্রগ্রাম, বাঘাবাড়ী, ফুলছড়ি, রৌমারী ও রাজিবপুরে নৌকা চলাচল করে।

অষ্টমীর মেলাঃ
প্রাচীন নদীবন্দর হিসেবে খ্যাত চিলমারীর অষ্টমীর মেলা সমগ্র দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি তীর্থ স্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র স্নানের তিনদিন পূর্ব থেকেই চিলমারীতে শুরু হয় আনন্দের জোয়ার। দুর-দুরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্যের পশরা সাজিয়ে এলাকাটিকে গড়ে তোলেন এক মহামিলন মেলায়। ১৯৪৫ সালের দিকে এ মেলাটি হতো মনতোলা নামক স্থানে। পূণ্যার্থীরা আসতেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। আসাম থেকেও প্রচুর লোক অংশ গ্রহণ করতো এ অষ্টমীর মেলায়। প্রতি বছর চৈত্র মাসের শুল্ক পক্ষের অষ্টমী দিনে এই মেলাটি হয় বলে মেলাটির নামকরণ করা হয়েছে “অষ্টমীর মেলা”। জমদগ্নি ঋষীর পুত্র ছিল ভূন্ডুরাম। হিন্দু শাস্ত্র ‘চৈতন্যম্মৃত’ মতে জানা যায়, এই জমদগ্নি ঋষির নিবাস স্থল ছিল বগুড়ার মহাস্থান গড়ে। তিনি খুব গুণী ঋষি ছিলেন। একদিন জন্মদগ্নি ঋষি তার পুত্র ভূন্ডুরামকে নির্দেশ দিলেন ‘যাও, এই মুহূর্তে কুঠার দিয়ে তোমার মাতা ও চার ভ্রাতাকে হত্যা কর’ পিতার এহেন অমানবিক নির্দেশ শুনে ভূন্ডুরাম কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে গেল। জমদগ্নি ঋষী পুত্রকে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবারও বলেন ‘যাও পিত্রাদেশ পালন কর, নচেৎ তুমি আমার কঠিন অভিশাপে অভিশপ্ত হবে’ উপায় অন্ত খুঁজে না পেয়ে অবশেষে ভূন্ডুরাম কুঠারের আঘাতে মা ও অপর চার ভাইকে হত্যা করল। কিন্তু একি কুঠার তো আর হাত থেকে পড়ছে না। ভূন্ডুরাম তখন ঐ অবস্থায় পিতৃচরণে লুটিয়ে কাঁদতে লাগলো এবং বলতে লাগলো ‘পিতা আমি তো পিত্রাদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি, এবার তুমি তোমার গুণের বলে আমার মা ও চার ভ্রাতাকে জীবিত করে দাও। পুত্রের কান্না দেখে পিতা ঋষী মৃত তার স্ত্রী ও চার পুত্রের জীবন দান করলেন। কিন্তু ভূন্ডুরামের হাত থেকে কুঠার তো আর খুলছে না। আবার ভূন্ডুরাম পিতার চরণে মাথা রাখলেন, বললেন ‘আমার হাত থেকে কুঠার পড়ছে না’? তুমি মাতৃহত্যা করার পাপে অভিশপ্ত। অভিশাপ মোচন না হওয়া পর্যন্ত কুঠার তোমার পড়বে না বৎস। তুমি যদি এ অভিশাপ থেকে ত্রাণ পেতে চাও, তাহলে তোমাকে ঐ কুঠার হাতে নিয়ে সমস্ত পীঠস্থান ভ্রমণ করতে হবে এবং সমস্ত পীঠস্থান ভ্রমণ শেষে যেতে হবে কোশলের বিষ্ণুদশা নামে পরিচিত দ্বিজের নিকট। তবেই তিনি তোমার এ অভিশাপ মোচনের পথ দেখিয়ে দিবেন। অবশেষে ভূন্ডুরাম পিতার পরামর্শ মত নিজ শরীরের সাথে আটকে যাওয়া অভিশপ্ত কুঠারটি নিয়ে চষে বেড়াতে লাগল গোটা ভারতবর্ষে যতগুলো পীঠস্থান আছে সর্বত্র। বিষ্ণুদশা ভূন্ডুরামের অভিশপ্ত হবার সমস্ত কাহিনী মনোযোগ দিয়ে শুনলেন এবং বললেন, যাও মানস্ সরবরে। সেখানে গিয়ে পর্বত কেটে হ্রদ সৃষ্টি কর। যে দিন তুমি হ্রদ কেটে সেই জলে স্নান করতে পারবে। ঐদিনই হবে তোমার মুক্তি। ভূন্ডুরাম ছুটে চললো মানস সরবরে এবং সেখানে পৌঁছে পর্বত কাটতে লাগলো। এভাবেই দিনের পর দিন, রাতের পর রাত বিরামহীনভাবে পর্বত কাটতে কাটতে একদিন ব্রহ্মপুত্র হ্রদ সৃষ্টি হলো, জলের স্রোতে ডুবে গেল ভূন্ডুরাম। কথিত আছে যে, ভূন্ডুরাম পর্বতের পাদদেশে ডুবে যাবার পর চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ত্রি-স্রোতের মাঝে ভেসে উঠেন এবং তার হাত থেকে কুঠার পড়ে যায়। ভূন্ডুরাম মাতৃহত্যার অভিশাপ থেকে মুক্তি পান। ঐদিনটি ছিল চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথি। সেই থেকে এই ধর্মের অনুসারীগণ জীবনের সকল পাপ মোচনের জন্য প্রতি বছর নির্দিষ্ট এই দিনটিতে স্নানের জন্য ছুটে আসেন চিলমারীতে।
এ দিনে অতি প্রত্যুষে পূণ্যার্থীরা সেলাই বিহীন বস্ত্রে জলে নেমে শরীর ভিজিয়ে বালুর উপর পিঁড়ি পেতে সারিবদ্ধ হয়ে বসেন বেলপাতা, ফুল, তুলসি পাতা, আতপ চাউল এবং কলা নিয়ে। স্নান শেষে সাধু সন্যাসীদের নিকট থেকে আর্শীবাদ গ্রহণ করেন। এ মেলাটিকে সুন্দর এবং আনন্দঘন পরিবেশে অনুষ্ঠিত করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন পুলিশ টহল, যাত্রী ছাউনী, পায়খানা নির্মাণ, পানীয় জলের ব্যবস্থা ও ভ্রাম্যমান চিকিৎসা কেন্দ্রের মাধ্যমে সার্বিক সুবিধা প্রদান করে থাকেন।

১৯৭৪ -এর আলোচিত বাসন্তিঃ
১৯৭৪ সাল। দেশ জুড়ে শুরু হয় ঘরে ঘরে অভাব। আকালের মরণ ছোবলে শত শত মানুষ তখন ভূখা, নাঙ্গা। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা জুড়ে খবর বেড়–চ্ছে মৃত মানুষের সচিত্র দলিল। সারা দেশের আকাশ বাতাস তখন ক্ষুধার্ত মানুষের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠে। তখনি, দেশের দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার পাতা জুড়ে ছাপা হলো সেই বিখ্যাত ঐতিহাসিক ছবিটি। সমস্ত শরীরে মাছ ধরার জাল জড়িয়ে লজ্জা নিবারণের মিথ্যে শান্তনা বুকে নিয়ে একটি মেয়ে কলা গাছের ভেলায় চড়ে কলা গাছের মাঞ্চা বা পাতা সংগ্রহ করছে, বন্যার পানিতে আরেকজন সাদৃশ্য নারী শ্রীমতি দূর্গতি রাণী বাঁশ হাতে ভেলার অন্য প্রান্তে বসে নিয়ন্ত্রণ করছে ভেলাটিকে। ছবিটি প্রকাশিত হওয়া মাত্রই বিশ্ব মানবতা নড়ে চড়ে উঠলো। রিলিফ আসতে লাগলো দেশ বিদেশ থেকে। পৃথিবীর গভীরতর বেদনার ক্ষতগুলো যেমন প্রতিদিন কালো অক্ষরের ফুল হয়ে ফুটে থাকে খবরের কাগজের পাতায় পাতায়। তেমনি এদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি বেদনাময় অধ্যায়ের নাম ‘বাসন্তী’ এমন কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বাসন্তি একটি মারাত্বক রাজনৈতিক ইস্যূতে পরিণত হয়ে যায়। চিলমারীর আর একবার পরিচিতি ঘটে বাসন্তির এলাকা বলে।
রাজনৈতিক অঙ্গণে চিলমারীঃ 
১৯৪৬ সালের গোড়ার দিকে ভারতব্যাপী সাধারণ নির্বাচনে চিলমারী-রৌমারী অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করেন মুসলীমলীগের নজির হোসেন খন্দকার (এম,এল,এ)। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে প্রাদেশিক আইন পরিষদে এ নির্বাচনী এলাকায় প্রতিনিধিত্ব করেন যুক্তপ্রন্ট প্রার্থী আবদুর রহমান মোক্তার (এম,এল,এ)। ১৯৬২ সালের জাতীয় নির্বাচনে উলিপুর, চিলমারী, রৌমারীসহ ময়মনসিংহ জেলার দেওয়ানগঞ্জ ও শ্রীবর্দী থানা নিয়ে গঠিত নির্বাচনী এলাকায় উলিপুরের প্রখ্যাত নেতা আবুল কাশেম মাত্র তিন ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হন। প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে জনাব আবুল কাশেমের সহোদর আবুল বাশার (এ,পি,এ) নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ সালে রংপুর জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান, ডাঃ লুৎফর রহমানকে আহবায়ক করে চিলমারী থানা আওয়ামীলীগের প্রথম আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন। অপরদিকে ১৯৫৭ সালের শেষ দিকে ন্যাপ চিলমারী থানা শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম সভাপতি ছিলেন প্রয়াত আমিনুদ্দৌলাহ ওরফে মিন্টু মিয়া এবং সম্পাদক খমির উদ্দিন আহম্মেদ। ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের সাদাকাত হোসেন ছক্কু মিয়া সংসদ সদস্য (এম,পি) নির্বাচিত হন।
১৯৭৮ সালে জাতীয় গণতান্ত্রিক দল জাগদল গঠিত হবার পর আমিনুদ্দৌলাকে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি করে চিলমারী কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করা হলে জয়নুল আবেদীনকে সভাপতি করে চিলমারী থানা কমিটি গঠন করা হয়।
১৯৮৫ সালে চিলমারী জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন থানাহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ সরকার (ভোলে) ও সাধারণ সম্পাদক এ, কে, এম ফজলুল হক সিদ্দিক।

আব্বাস উদ্দিনের চিলমারীঃ
‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, হাকাও গাড়ী তুই চিলমারীর বন্দরে’ ভাওয়াইয়া ও পল্লীগীতির সম্রাট আব্বাস উদ্দিন চিলমারীতে জম্মাননি। তবুও তিনি চিলমারীর মানুষের আত্মার মানুষ। ১৯১৩ সালের কথা। শিল্পীর দুর সম্পর্কের এক চাচা চাকুরী করতেন এখানে। সেই সুবাদে তিনি চিলমারীতে ছিলেন বছর খানেক। সে সময় সুদেন বাবু ও সুরেশ বাবুর সাথে গড়ে উঠে শিল্পীর আত্মার সম্পর্ক। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মিশুক প্রকৃতির।
১৯৬০ কি ১৯৬২ হবে। শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের জনপ্রিয়তা তখন গগনচুম্বী। চিলমারীতে রেখে যাওয়া শিল্পীর বাল্য জীবনের খেলার সাথী সুদেন বাবু, সুরেশ বাবুরা আমন্ত্রণ জানালেন শিল্পীকে। জীবন প্রবাহে ফেলে আসা চিলমারীকে তার মনে পড়লো। হৃদয়ের টানে চিলমারীর পানে আসবেন বলে তিনি কথা দিলেন। দিন, ক্ষণ তারিখ ঠিক হয়ে গেল। মঞ্চ তৈরী করা হলো পুরাতন বন্দর নগরী চিলমারী বাজারে। মহুকুমা শহর কুড়িগ্রাম থেকে চিলমারী আসবার জন্য কোন পরিবহন ব্যবস্থা ছিল না। পরিবহন ব্যবস্থা বলতে যা ছিলো তা হলো গরুর গাড়ি। পরবর্তীতে রংপুর  থেকে একটা কয়লার ইঞ্জিন সমন্বিত রেল গাড়ি ঝিক্ ঝিক্ আওয়াজ আর কান তালা লাগানো হুইসেল বাজিয়ে মহুকুমা শহর পর্যন্ত আসতো। তার পরেই যন্ত্র সম্বলিত দানবের দৌড় শেষ। শুরু হতো গরুর গাড়ির ক্যাঁচর ক্যাঁচর।
শিল্পী কুড়িগ্রামে এসে পৌঁছলেন বিকাল ৪টায়। শিল্পীকে নিয়ে আসবার জন্য পাঠানো হয়েছে গরুরগাড়ী। চিলমারী থানার রমনা নিবাসী গাড়িয়াল আব্দুল গনি তখন অপেক্ষায় শিল্পীর। শিল্পীর অপেক্ষায় হাজার হাজার দর্শক শ্রোতা।
সকাল দশটা থেকে তারা মঞ্চের সামনে বসে অপেক্ষমান। ম্যানেজিং কমিটির ঘন ঘন শান্তনা বাণী শুনতে শুনতে দর্শকের প্রাণ ওষ্ঠাগত। কিন্তু শিল্পী নেই। মাঝে মাঝে দর্শকের কোরাস চিৎকারে সুদেন বাবু, সুরেশ বাবু তখন বিব্রতকর পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যস্ত। ওদিকটায় গরুর গাড়ীর কাঁচর ক্যাঁচর শব্দ তুলে ছুটে চলছে চিলমারী বন্দরে। সুর্য ডুবু ডুবু। শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আর সহোদর ভাই আবদুল করিম। যোগাযোগ ব্যবস্থার এ নাজেহাল অবস্থায় পরে দু‘ভাই অনুধাবন করেছিলেন অপেক্ষমান দর্শকের প্রকৃত অবস্থা। দর্শককুলকে শান্ত করতে হবে। প্রমাণ করতে হবে আব্বাস-আব্বাসই। চলন্ত গাড়ীর ছই এর তলে বসে আব্দুল করিম লিখলেন কিংবদন্তির সেই গান “ওকি গাড়ীয়াল ভাই হাকাও, গাড়ী তুই চিলমারীর বন্দরে” সুর করলেন শিল্পী নিজেই। চিলমারীতে আব্বাস উদ্দিন যখন পৌঁছলেন তখন সন্ধ্যার কালো আধাঁর নেমে এসেছে পৃথিবী জুড়ে। মঞ্চে উঠেই তিনি শুরু করলেন বিখ্যাত এই গানটি। শিল্পী আব্বাস উদ্দিন কিংবদন্তি হয়ে রইলেন চিলমারীর মানুষের হ্নদয়ে সেই বিখ্যাত গানটি গেয়ে ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, হাকাও গাড়ী তুই চিলমারীর বন্দরে’ শিল্পীর সেই বন্ধুরা আজ আর বেঁচে নেই। বেঁচে নেই শিল্পী নিজেও।
চিলমারীর মাটি ও মানুষের প্রাণের শিল্পী আব্বাস উদ্দিনকে স্মরণীয় করে রাখতে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আব্বাস উদ্দিন একাডেমী।
সংগীত এবং নাটকের মাধ্যমে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের যে কৌশল শুরু হয় তাতে চিলমারীর অবদান স্মরণীয়। ১৯৩৩ সালে চিলমারীতে ২টি নাট্য সংগঠন ছিল ‘চিলমারী নাট্য সংস্থা’ এবং ‘শাখাহাতি নাট্য সংস্থা’ চন্দ্রগুপ্ত, সুলতানা রাজিয়া ও রংগিলা নায়ের মাঝি ঐ সময়ের উল্লেখযোগ্য নাটক। অনেক পরে হলেও খরখরিয়া শিল্পী গোষ্ঠি, জোড়গাছ স্মৃতি সংসদ, নিবেদিতা সাংস্কৃতিক সংগঠন, প্রত্যাশা ক্লাব, আব্বাস উদ্দিন একাডেমী, আরডিআরএস, থানাহাট ইউনিয়ন সমাজ কল্যাণ সংস্থা, শিহরণ গণনাট্য দল এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে।

শিক্ষাঙ্গনে চিলমারীঃ
চিলমারী দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয় কুড়িগ্রাম জেলার মুসলিম ছাত্রদের জন্য ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান রূপে অবদান রেখেছে। ঐ সময়ে ভূরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ী, চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর থেকে অনেক মুসলমান ছাত্ররা চিলমারী দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছে। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষা ক্ষেত্রে এ এলাকাটি অনেক পিছিয়ে পড়েছে। নদী ভাঙ্গণ এবং কর্মসংস্থানের অভাব শিক্ষার আগ্রহকে বিপর্যস্থ করেছে। সামাজিক শিক্ষা ক্ষেত্রেও বিরুপ প্রভাব ফেলেছে। পারিবারিক কলহ, বিবাহ বিচ্ছেদ এবং নারী নির্যাতন এ অঞ্চলে তাই অপেক্ষাকৃত বেশী। চর এলাকায় এ সমস্যা আরও প্রকট। গুটি কয়েক স্কুল কলেজ থাকলেও ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা অত্যন্ত কম। ফলশ্রুতিতে উচ্চাকাঙ্খা না থাকায় মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ছে না। উচ্চ শিক্ষার অবস্থাও অত্যন্ত খারাপ। ২ বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে চিলমারী ডিগ্রী কলেজ, চিলমারী মহিলা ডিগ্রী কলেজ, গোলাম হাবিব মহিলা ডিগ্রী কলেজ ও চিলমারী টেকনিক্যাল এন্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ রয়েছে।

বৃদ্ধাশ্রমঃ
২০০৭ সালের জুলাই মাসে জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর (অবঃ) আশরাফ-উদ-দৌলা (তাজ) এর সহধর্মিনী বেগম জেসমিন আশরাফের ব্যক্তিগত উদ্যোগে রমনা ইউনিয়নের রমনা মিস্ত্রিপাড়ায় প্রতিষ্ঠা করেন সাপোর্ট দ্যা ওল্ড ফাউন্ডেশন এন্ড ট্রাষ্ট (সফট্) সেখানে আশ্রয় পেয়েছে ১২ ভূখা-নাঙ্গা ও সহায় সম্বলহীন বৃদ্ধ। আগামীতে বৃদ্ধাশ্রমটি আশ্রয় পাবে ১শ‘ জন নারী ও ১শ‘ জন পুরুষ।

গোলাম হাবিব শিশু সদনঃ
১৯৯১ সালে রমনা ইউনিয়নের রমনায় সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম হাবিব দুলাল তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন গোলাম হাবিব শিশু সদন। যেখানে এতিম ছেলেমেয়েদের ভরণপোষণ, ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষা, দর্জি প্রশিক্ষণ দিয়ে এতিমদের কর্মমূখী করে গড়ে তোলা হচ্ছে।

প্রাচীন নির্দশণঃ 
চিলমারীর ফকিরেরহাট এলাকার কিংবদন্তির রাজা গোপী চাঁদ আমলের পূরাকীতির নিদর্শন আজও পাওয়া যায়। রাজা গোপী চাঁদের রাজ প্রাসাদ ১৪০০ সালের পরে মাটির নীচে ডেবে যায়। ফকিরের হাটের মাটিতে কোদাল চালালে আজও বেরিয়া আসবে অনেক পুরাকৃতি।
রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের কাঁচকোল গ্রামে কালের সাক্ষ্য দিচ্ছে এই গম্বুজটি। ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে এতদাঞ্চলের জমিদারের সেরেস্তাদার গম্বুজের উপরে উঠে যতদূর চোখ যায় দেখে নিতেন তার দখলীয় জমির ফসল। প্রজারা কিভাবে চাষাবাদ করেছে তিনি তা সহজেই দেখতে পেতেন। সংস্কারের অভাবে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে কালের সাক্ষী এই গম্বুজটি।

থানাহাট ইউনিয়নে অবস্থিত মোঘল আমলে নির্মিত মজিদের পাড় জামে মসজিদ। চিলমারী উপজেলা সদর থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার উত্তরে মোঘল স্থাপত্য শিল্পের অনন্য এক নিদর্শণ মসজিদের পাড় জামে মসজিদ। মসজিদটির নির্মাণকালীন সময়ে দেয়ালে ফার্সি ভাষায় নাম লিপিবদ্ধ করা ছিল। বিভিন্ন সময়ে সংস্কার করতে গিয়ে এই নামটি ঢাকা পড়ে যায়। এলাকাবাসী ভার্সী শিক্ষায় শিক্ষিত না হওয়ায় মসজিদটির আসল নামটি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। মসজিদটির কারণে এলাকাটির নামকরণ করা হয়েছে মসজিদের পাড়। এরই ধারাবাহিকতায় এলাকার নাম অনুযায়ী মসজিদের পাড় জামে মসজিদ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। স্থানীয় লোকজন জানায়, মোঘল সম্রাট শাহজাহানের সময় এ মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। ইতিহাসে এর নির্মাণকাল সম্পর্কে কোন তথ্য না থাকায় সঠিক নির্মাণকাল সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। মসজিদটি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট বর্গাকার। তিন ফুট চওড়া দেয়াল, দৈর্ঘ্য ৫০ ফুট। মসজিদটির পশ্চিম দেয়ালে বিভিন্ন লতাপাতার চিত্রকর্ম সজ্জিত মেহরাব, মসজিদের সামনে খিলানযুক্ত তিনটি প্রবেশ পথ রয়েছে। এগুলোতে রয়েছে লতাপাতার ও বিভিন্ন ফলের খোদাই করা ছবি। মসজিদের উত্তরে ও দক্ষিণ দিকে একটি করে দুই খিলাল যুক্ত জানালা রয়েছে। মসজিদের বাহিরে চারকোনে দেয়াল ঘেঁষে প্রশস্ত চার স্তম্ভের মাথায় একটি করে ৪টি গম্বুজ রয়েছে। ৫০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩০ ফুট প্রশস্ত বিশিষ্ট ছাদ বিশাল ৩টি গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত। প্রায় ৫০০ বছর আগে মোঘল সম্রাট কর্তৃক নির্মিত পূরাকৃতি আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের মদন মহনে বৃটিশ সরকারের সময় মদনমহন সরকার একটি মন্দির নির্মাণ করেন। ১৯৪০-১৯৬৫ সাল পর্যন্ত মহারাজা শিরিষ চন্দ্র নন্দীর ষ্টেটে জমিদারী করতেন মদন মহন সরকারের পুত্র রজনী কান্ত সরকার। মদনমহন সরকারের মৃত্যুর পর জমিদার রজনী কান্ত একবার মন্দিরটি সংস্কার করেন। মন্দিরটি কালি মন্দির নামে পরিচিত। জমিদার রজনী কান্তের মৃত্যুর পর তার বংশধররা আর্থিক দৈন্যতার কারণে মন্দিরটি আর সংস্কার করেননি। ফলে অতি পুরাতন এই মন্দিরটি হারিয়ে ফেলছে তার অতীত ঐতিহ্য। 

চিলমারী ইস্তেহারঃ
১৯৯৭ সালে চিলমারীর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থ রচনা করেন সাংবাদিক ও শিক্ষক নাজমুল হুদা পারভেজ। গ্রন্থটিতে রয়েছে চিলমারী উপজেলার সার্বিক তথ্য।
‘গাড়িয়াল ভাই’য়ের গাড়ি আর হাকে না চিলমারী বন্দরের পানে। ব্রহ্মপুত্র নদের বুক জুড়ে এখন কুলবধুদের শত স্বপ্ন বালুতে পরিণত হয়েছে। অভাবী এই জনপদে কাজ মেলে না। অনেকে কাজের সন্ধানে চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বাসন্তির পর চিলমারীর মানুষের মাঝে নতুন নামে স্থান করে নিয়েছে মঙ্গা। তাই গ্রামের বৌর হাড়িতে ভাত রান্না হয় দিনে একবার কখনো বা দু‘বার। অনেকের কপালে ভাত জুটে না দু’বেলা। অপুষ্টি আর নানা রোগ-শোকে আক্রান্ত হচ্ছে এখানকার মানুষ। আর নারীদের কষ্টের কোন অন্ত নেই। দরিদ্র মানুষেরা কঠোর সংগ্রাম করে। বার বার নদী ভাঙ্গণ, আর্শ্বিন-কার্তিকের মঙ্গার ছোবল ও দফায় দফায় বন্যায় সর্বশান্ত আজ চিলমারীর মানুষদের দেখে বেদনার কবি জীবনানন্দের সেই কথাটিই মনে হয় বার বার, ‘যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা’ তবুও চিলমারীর মানুষ বেঁচে আছে। আছে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। চিলমারীর মানুষ শুধু নিতে জানে না, তারা দিতেও জানে। দেশের উত্তরাঞ্চলে সিডরে ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য বাড়িয়ে দিয়েছে সাহায্যের হাত। বন্যায় খড়ায় নিজের এলাকা ছাড়া বিকভিন্ন এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রমাণ রয়েছে।  চরাঞ্চলের কৃষক মাটিতে হাত দিলেই বলে দিতে পারে এই মাটি বেঁলে, এঁটেল নাকি দো-আঁশ। কি ফলবে এই মাটিতে। রাতের বেলা আকাশের তাঁরা দেখে নৌকার মাঝি নৌকা চালায়, তবুও তাদের বলা হয় মঙ্গার দেশের মানুষ। মঙ্গা নিরসনে চাই স্থায়ী পরিকল্পনা। এজন্য সর্বাগ্রেই প্রয়োজন নদী ভাঙ্গণ রোধ করা। ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙ্গণ রোধে স্থায়ী পরিকল্পনা নিতে হবে সরকারকে। এখানে চরাঞ্চলের বালুতেই প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হচ্ছে বাদাম, ডাল, ভুট্টা। কিছু বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের বদৌলতে প্রতিটি গাভী দুধ দিচ্ছে ২০/২৫ লিটার। আর মজুরীর হার কম, কাঁচা মাল সহজলভ্য। তাই এখানে কলকারখানা গড়ে তুললে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। প্রয়োজনে সরকারের অনুরোধ করা যেতে পারে এই অঞ্চলের কল কারখানার মালামাল পরিবহনের জন্য যমুনা সেতুর টোলের হার কমাতে হবে। চিলমারী বন্দর পূনঃ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবেই এ এলাকার মানুষের মঙ্গা নিরসন হবে। এখানকার মানুষ মঙ্গা নামে আর বাঁচতে চায় না। আবারো ধনধান্যে ভরে উঠবে গোলা। নতুন করে জন্ম হবে না কোন বাসন্তির।


তথ্য সূত্রঃ
কুড়িগ্রাম জেলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি, লেখক- মোস্তফা তোফায়েল হোসেন ও চিলমারী ইস্তেহার, লেখক- সাংবাদিক সহকারী অধ্যাপক নাজমুল হুদা পারভেজ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন